
إنَّ الحَمْدَ لِلّٰهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللّٰهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللّٰهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ ﷺ أما بعد:
প্রিয় মুসল্লিগণ!
আল্লাহ তাআলার অশেষ দয়া যে তিনি আমাদেরকে জ্ঞান, সময় এবং আধুনিক প্রযুক্তির যুগে জীবনযাপনের সুযোগ দিয়েছেন। এই যুগের অন্যতম বড় নিয়ামত হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Social Media)—ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি।
আজ আমরা আলোচনা করব—ইসলামের দৃষ্টিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ
“প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)
আমাদের জীবন, সময়, চোখ, কান—সবই আল্লাহর আমানত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই আমানতেরই একটি অংশ।
হাদিসে এসেছে—
نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
“দুটি নিয়ামত আছে, যার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পড়ে—সুস্থতা ও অবসর সময়।” (সহিহ বুখারি)
আজকের যুগে এই “ফারাগ” বা অবসর সময়ের বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
সোশ্যাল মিডিয়া নিজে খারাপ নয়। এটি একটি যন্ত্র, কিন্তু এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এটি নিয়ামত নাকি ফিতনা।
ভালো ব্যবহার:
খারাপ ব্যবহার:
আল্লাহ বলেন—
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ .
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকে।” (সূরা ক্বাফ: ১৮)
ফেসবুক পোস্ট, কমেন্ট, শেয়ার—সবই লিখিত “আমলনামা” হয়ে যাচ্ছে।
আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—অনলাইন গিবত ও ট্রলিং সংস্কৃতি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا.
“তোমরা একে অপরের গিবত করো না… তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?” (সূরা হুজুরাত: ১২)
একটি কমেন্ট, একটি শেয়ার, একটি মিম—কারো সম্মান ধ্বংস করে দিতে পারে।
হাদিসে রাসূল ﷺ বলেন—
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده
“প্রকৃত মুসলিম সেই, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (সহিহ বুখারি, মুসলিম)
আজকের যুব সমাজ দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রলিং করে কাটিয়ে দিচ্ছে।
আল্লাহ বলেন—
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ
“সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে।” (সূরা আসর: ১–২)
সময় নষ্ট করা মানে নিজের জীবন নষ্ট করা।
একজন সালাফ বলতেন:
“আমি এমন এক জাতিকে দেখেছি যারা সময়কে স্বর্ণের চেয়েও মূল্যবান মনে করত।”
ইসলাম আমাদের সুন্দর দিকনির্দেশনা দেয়।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।” (সূরা তাওবা: ১১৯)
ফেক নিউজ, গুজব—এসব থেকে দূরে থাকতে হবে।
রাসূল ﷺ বলেন—
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
“আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।” (সহিহ বুখারি)
সোশ্যাল মিডিয়া হতে পারে দাওয়াতের শক্তিশালী মাধ্যম।
আল্লাহ বলেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
“মুমিনদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে।” (সূরা নূর: ৩০)
অশ্লীল কনটেন্ট থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে।
দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য রাখা উচিত।
বাকি সময়—ইবাদত, পড়াশোনা, পরিবার, কাজ।
একজন যুবক প্রতিদিন ৬–৭ ঘণ্টা ফেসবুকে সময় নষ্ট করত। ফলস্বরূপ তার পড়াশোনা নষ্ট হয়, মানসিক চাপ বাড়ে।
পরে সে সময় সীমা নির্ধারণ করে, কুরআন তিলাওয়াত শুরু করে—জীবন পরিবর্তন হয়।
আরেকজন ভাই ইউটিউবে ইসলামিক ভিডিও আপলোড শুরু করেন। হাজার হাজার মানুষ হিদায়াত পায়।
একই মাধ্যম—ভিন্ন ব্যবহার।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা!
আমাদের উচিত—
اللهم اجعلنا من الذين يستمعون القول فيتبعون أحسنه
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো যারা কথা শোনে এবং উত্তমটি অনুসরণ করে।”
إن الله يأمر بالعدل والإحسان وإيتاء ذي القربى وَیَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
ভূমিকা
বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। Facebook, YouTube, TikTok, Instagram, Messenger ও WhatsApp-এর মতো মাধ্যমের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে তথ্য, ছবি, ভিডিও ও মতামত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়া নিজে ভালো বা মন্দ নয়। এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এটি কল্যাণের মাধ্যম হবে, নাকি ক্ষতির কারণ হবে।
সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষা, দাওয়াত, যোগাযোগ ও মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে অপব্যবহারে এটি সময়ের অপচয়, মিথ্যা তথ্য, গীবত, অশ্লীলতা, আত্মপ্রদর্শন ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হতে পারে।
১. সময়ের অপচয়
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আসরে সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন—
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ
“সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।”
অনেক সময় কয়েক মিনিটের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া খুলে দীর্ঘ সময় অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ে চলে যায়।
তাই নিজের কাছে প্রশ্ন করা প্রয়োজন—
আমি কি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছি, নাকি সোশ্যাল মিডিয়াই আমার সময়কে নিয়ন্ত্রণ করছে?
২. যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার
সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মানেই তথ্যটি সত্য—এমন নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا .
“কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।” —সূরা আল-হুজুরাত: ৬
তাই কোনো সংবাদ, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার করা উচিত নয়।
নীতি: আগে যাচাই, তারপর প্রচার।
৩. গীবত ও কটূক্তি
অনলাইনে মানুষ অনেক সময় এমন কথা লিখে ফেলে, যা সামনাসামনি বলতে সংকোচ বোধ করত।
কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিন আমাদের আল্লাহর জবাবদিহি থেকে মুক্ত করে না।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্পর্কে অপমানজনক মন্তব্য, বিদ্রূপ, গীবত বা কটূক্তি থেকে বিরত থাকতে হবে।
একটি সহজ নীতি গ্রহণ করা যায়—
“যে কথা সামনে বলা অনুচিত, তা অনলাইনেও বলা অনুচিত।”
৪. অশ্লীলতা ও দৃষ্টির হেফাজত
সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল ও অনৈতিক কনটেন্ট সহজেই সামনে আসে।
একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের দৃষ্টি ও অন্তরকে হেফাজত করা।
তাই অনৈতিক কনটেন্ট সামনে এলে তা এড়িয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে ব্লক বা রিপোর্ট করা এবং নিজের ফিডকে ইতিবাচক ও উপকারী কনটেন্ট দিয়ে সাজানো উচিত।
৫. আত্মপ্রদর্শন ও লাইক–নির্ভরতা
সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি সূক্ষ্ম সমস্যা হলো মানুষের প্রশংসার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ।
কত লাইক পেলাম?
কতজন প্রশংসা করল?
কতজন শেয়ার করল?
এই বিষয়গুলো যেন আমাদের আত্মমূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড না হয়ে যায়।
ভালো কাজ প্রকাশের প্রয়োজন হলে তা করা যেতে পারে; তবে নিজের প্রচার ও প্রশংসা যেন উদ্দেশ্য হয়ে না দাঁড়ায়।
৬. অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক
সোশ্যাল মিডিয়ায় সামান্য একটি মন্তব্য থেকেও দীর্ঘ বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
সব বিষয়ে মন্তব্য করা জরুরি নয় এবং সব বিতর্কে জয়ী হওয়াও প্রয়োজনীয় নয়।
সময়, ভাষা ও মর্যাদা রক্ষা করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত ও শালীন বক্তব্য দেওয়া উচিত।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক বিষয় প্রকাশ্য বিতর্কে না নিয়ে যথাযথ পদ্ধতিতে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
৭. সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ব্যবহার
সোশ্যাল মিডিয়া শুধু ক্ষতির মাধ্যম নয়; এটি একটি বড় সুযোগও।
এটি ব্যবহার করা যেতে পারে—
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—
শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারী হওয়া নয়; বরং কল্যাণকর কনটেন্টের নির্মাতা হওয়া।
একজন সচেতন ব্যবহারকারীর ৭টি নীতি
১. সোশ্যাল মিডিয়ায় সময়ের সীমা নির্ধারণ করা।
২. যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ বা তথ্য প্রচার না করা।
৩. গীবত, অপমান ও কটূক্তি থেকে বিরত থাকা।
৪. অশ্লীল ও অনৈতিক কনটেন্ট এড়িয়ে চলা।
৫. আত্মপ্রদর্শন ও অতিরিক্ত প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা থেকে সতর্ক থাকা।
৬. অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে সময় নষ্ট না করা।
৭. জ্ঞান, দাওয়াত ও মানুষের কল্যাণে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা।
আত্মমূল্যায়ন
নিজেকে প্রশ্ন করি—
উপসংহার
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও পরীক্ষা।
একটি ভালো পোস্ট বহু মানুষের উপকার করতে পারে। আবার একটি মিথ্যা তথ্য, অশালীন কনটেন্ট বা কটূক্তিও অনেক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই প্রতিবার পোস্ট, কমেন্ট বা শেয়ার করার আগে চারটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—
এটি কি সত্য?
এটি কি প্রয়োজনীয়?
এটি কি উপকারী?
এতে কি আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন?
এই নীতিগুলো অনুসরণ করতে পারলে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ না হয়ে জ্ঞান, দাওয়াত ও মানুষের কল্যাণের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ের মূল্য বোঝার, সত্য যাচাই করার, দৃষ্টি ও জিহ্বার হেফাজত করার এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে উত্তম কাজে ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
We use cookies to improve your experience on our site. By using our site, you consent to cookies.
Manage your cookie preferences below:
Essential cookies enable basic functions and are necessary for the proper function of the website.
These cookies are needed for adding comments on this website.
These cookies are used for managing login functionality on this website.
Statistics cookies collect information anonymously. This information helps us understand how visitors use our website.
Google Analytics is a powerful tool that tracks and analyzes website traffic for informed marketing decisions.
Service URL: policies.google.com (opens in a new window)
Marketing cookies are used to follow visitors to websites. The intention is to show ads that are relevant and engaging to the individual user.
Google Maps is a web mapping service providing satellite imagery, real-time navigation, and location-based information.
Service URL: policies.google.com (opens in a new window)
You can find more information in our Cookie Policy and .