আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

কিয়ামতের আলামত

কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে পূর্ণাঙ্গ জুমার খুতবা

কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আমাদের কিয়ামতের ছোট ও বড় আলামত সম্পর্কে অবহিত করেছে, যাতে আমরা আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি। এই পূর্ণাঙ্গ জুমার খুতবায় কিয়ামতের আলামত, কুরআনের আয়াত, সহিহ হাদিস, দোয়া এবং বাস্তব করণীয় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে আলোচনা কৌতূহল বা সময় নির্ধারণের জন্য নয়; বরং ঈমান দৃঢ় করা, নেক আমলে উদ্বুদ্ধ হওয়া এবং আল্লাহর আনুগত্যে অটল থাকার জন্য।


প্রথম খুতবা

خطبة الحاجة

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ. أما بعد

হে আল্লাহর বান্দাগণ!

আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি।

আজকের খুতবার বিষয়—

কিয়ামতের আলামত

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে। এটি ঈমানের অন্যতম মৌলিক বিষয়। কিন্তু কিয়ামত কখন হবে, সে জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে। তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো কিয়ামতের সময় নিয়ে অনুমান না করে তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।


কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ﴾

অর্থঃ “নিশ্চয়ই কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।” (সূরা লুকমান: ৩৪)

আরও বলেন—

﴿اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ﴾

অর্থঃ “মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীন হয়ে মুখ ফিরিয়ে আছে।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ১)


কিয়ামতের ছোট আলামত

সহিহ হাদিসে বর্ণিত ছোট আলামতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ইলম কমে যাওয়া এবং আলেমদের ইন্তিকাল।
  • অজ্ঞতার বিস্তার।
  • যিনা-ব্যভিচারের প্রসার।
  • সুদের ব্যাপক বিস্তার।
  • মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রসার।
  • গান-বাজনা ও অশ্লীলতার বিস্তার।
  • আমানতদারিতা কমে যাওয়া।
  • মিথ্যা, প্রতারণা ও হত্যা বৃদ্ধি।
  • সময় দ্রুত অতিক্রম হচ্ছে বলে অনুভূত হওয়া।
  • উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণে প্রতিযোগিতা।

রাসূল ﷺ-এর সতর্কবাণী

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ»

(তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি রেখে ইশারা করলেন।)

অর্থঃ “আমি এবং কিয়ামত এ দুটি আঙুলের মতো নিকটবর্তী অবস্থায় প্রেরিত হয়েছি।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)


ছোট আলামত থেকে আমাদের শিক্ষা

  • গুনাহ থেকে তাওবা করা।
  • কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা।
  • ফিতনা থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা।
  • নেক আমলে প্রতিযোগিতা করা।
  • মৃত্যুর আগে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

أقول قولي هذا وأستغفر الله لي ولكم ولسائر المسلمين، فاستغفروه إنه هو الغفور الرحيم.


দ্বিতীয় খুতবা

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

সহিহ হাদিসে কিয়ামতের কয়েকটি বড় আলামতের কথাও বর্ণিত হয়েছে। এসব আলামত একের পর এক প্রকাশিত হবে এবং কিয়ামত অত্যন্ত নিকটে চলে আসবে।


কিয়ামতের বড় আলামত

সহিহ হাদিসে বর্ণিত প্রধান বড় আলামতগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ইমাম মাহদীর আবির্ভাব।
  • দাজ্জালের আগমন।
  • ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অবতরণ।
  • ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়া।
  • ধোঁয়া (দুখান)।
  • দাব্বাতুল আরদ (ভূমি থেকে বিশেষ প্রাণীর বের হওয়া)।
  • সূর্যের পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া।
  • পূর্ব, পশ্চিম ও আরব উপদ্বীপে তিনটি বড় ভূমিধস।
  • ইয়েমেনের দিক থেকে আগুন বের হয়ে মানুষকে সমবেত হওয়ার স্থানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া।

কিয়ামতের আলামত জানার উদ্দেশ্য

কিয়ামতের আলামত জানার উদ্দেশ্য কখনোই অপ্রমাণিত গল্প প্রচার করা, গুজব ছড়ানো বা কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো—

  • ঈমানকে দৃঢ় করা।
  • তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
  • নেক আমল বৃদ্ধি করা।
  • মৃত্যু ও আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
  • কুরআন ও সহিহ সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করা।
  • দাজ্জালসহ সব ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নেক আমল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«إِذَا قَامَتِ السَّاعَةُ وَفِي يَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ، فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا تَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَغْرِسْهَا»

অর্থঃ “যদি কিয়ামত শুরু হয়ে যায় এবং তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে, আর সে তা রোপণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা রোপণ করে।” (মুসনাদ আহমাদ; সহিহ সনদে বর্ণিত)

এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও নেক কাজ, কল্যাণকর কাজ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।


আমাদের করণীয়

  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।
  • নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।
  • রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
  • তাওবা ও ইস্তিগফারকে জীবনের অংশ বানানো।
  • হারাম কাজ ও ফিতনা থেকে দূরে থাকা।
  • সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা প্রদান করা।
  • আখিরাতের সফলতার জন্য নেক আমল বৃদ্ধি করা।
  • দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করা এবং সূরা আল-কাহফ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা।

দোয়া

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ الثَّبَاتَ عَلَى دِينِكَ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ، وَمِنْ فِتَنِ الْحَيَاةِ وَالْمَمَاتِ، وَارْزُقْنَا حُسْنَ الْخَاتِمَةِ.

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনার দীনের ওপর অটল রাখুন। দাজ্জালের ফিতনা এবং জীবন ও মৃত্যুর সব ফিতনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমাদেরকে উত্তম পরিণতি (হুসনুল খাতিমাহ) দান করুন।

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ، وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ، الْأَحْيَاءِ مِنْهُمْ وَالْأَمْوَاتِ.

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ


সমাপনী আয়াত

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

فَاذْكُرُوا اللَّهَ يَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوهُ عَلَى نِعَمِهِ يَزِدْكُمْ، وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ. وأقم الصلاة


উপসংহার

প্রিয় মুসল্লিগণ! কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্য কৌতূহল মেটানো বা কিয়ামতের সময় নির্ধারণ করা নয়; বরং নিজেদের ঈমানকে সুদৃঢ় করা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। তাই আমাদের উচিত নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করা, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত ও নেক আমলে অগ্রসর হওয়া, হারাম ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা এবং কুরআন ও সহিহ সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ রাখুন, দাজ্জালসহ সব ফিতনা থেকে হেফাজত করুন, হুসনুল খাতিমাহ দান করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। আমীন।