بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا أما بعد:
সম্মানিত ঈমানদার ভাই ও বোনেরা,
আল্লাহ তা’আলা মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষা করার জন্য। এই পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। মুখে ঈমানের দাবি করা সহজ, কিন্তু আল্লাহর জন্য নিজের প্রিয় বস্তু, সম্পদ, সময়, স্বার্থ এমনকি নিজের জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই প্রকৃত ঈমানের পরিচয় প্রকাশ পায়।
ত্যাগ বা কুরবানী বলতে শুধু পশু জবাই করাকে বোঝায় না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার নামই প্রকৃত কুরবানী।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ ۚ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ
“তোমরা কখনো প্রকৃত নেকী লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।”
(সূরা আলে ইমরান: ৯২)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়—যে জিনিস আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেটিই ত্যাগ করার মধ্যেই প্রকৃত ঈমানের প্রকাশ ঘটে।
ত্যাগের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেন আল্লাহর খলীল হযরত ইবরাহীম (আ.)।
আল্লাহ বলেন—
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَىٰ
“হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এখন বলো, তোমার মতামত কী?”
(সূরা আস-সাফফাত: ১০২)
হযরত ইসমাঈল (আ.) উত্তর দিলেন—
يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
“হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”
এই ঘটনা আমাদের শেখায়—আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের ইচ্ছা, ভালোবাসা ও আবেগকে বিসর্জন দেওয়াই প্রকৃত কুরবানী।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ
“আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; বরং তোমাদের তাকওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে।”
(সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)
অতএব কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হলো—তাকওয়া অর্জন, আল্লাহর আনুগত্য এবং আত্মসমর্পণের শিক্ষা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ
“কুরবানীর দিন আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিত করার (কুরবানী করার) চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।”
(তিরমিযী)
তিনি আরও বলেন—
مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
“যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।”
(ইবন মাজাহ)
সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর জীবন ছিল ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) আল্লাহর পথে নিজের সমস্ত সম্পদ দান করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন—
“তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?”
তিনি বললেন—
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।”
অন্যদিকে হযরত উমর (রাঃ) নিজের অর্ধেক সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আবু বকর (রাঃ)-এর ত্যাগ ছিল আরও মহান।
আজ আমাদের অনেকেই পশু কুরবানী করি, কিন্তু নফসকে কুরবানী করি না।
আজ প্রয়োজন—
হারাম উপার্জন ত্যাগ করা।
সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতি বর্জন করা।
নামায প্রতিষ্ঠা করা।
কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করা।
দাওয়াত ও দ্বীনের কাজে সময় দেওয়া।
আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা।
নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর বিধানের অধীন করা।
এগুলোই আধুনিক যুগের প্রকৃত কুরবানী।
আল্লাহ বলেন—
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের জান্নাতের বিনিময়ে তাদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন।”
(সূরা আত-তাওবাহ: ১১১)
আরও বলেন—
وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ
“তোমরা নিজেদের জন্য যে সৎকাজই অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।”
(সূরা আল-বাকারা: ১১০)
১. প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।
২. হালাল উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকা।
৩. নিয়মিত দান-সদকা করা।
৪. দ্বীনের কাজে সময় ও শ্রম ব্যয় করা।
৫. সন্তানদের ইবরাহীম (আ.)-এর ত্যাগের শিক্ষা দেওয়া।
৬. কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
৭. নিজের নফস, অহংকার ও পাপকে কুরবানী করা।
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা,
কুরবানী কেবল একটি পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি একটি জীবনদর্শন। একজন মুমিন প্রতিদিন নিজের প্রবৃত্তি, লোভ, অহংকার এবং পাপকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করেন। আল্লাহর পথে ত্যাগ ছাড়া প্রকৃত ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না।
আসুন, আমরা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আনুগত্য, হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর আত্মসমর্পণ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর ত্যাগের আদর্শ অনুসরণ করে নিজেদের জীবনকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করি।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْمُخْلِصِينَ، وَارْزُقْنَا التَّقْوَى، وَتَقَبَّلْ قُرْبَانَنَا وَأَعْمَالَنَا، وَاغْفِرْ لَنَا وَلِوَالِدِينَا وَلِجَمِيعِ الْمُسْلِمِينَ، آمِينَ.
وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ، وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.