بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أما بعد،
সম্মানিত ঈমানদার ভাইয়েরা!
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন একটি উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যে উম্মত মানবজাতির সর্বোত্তম উম্মত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
অর্থ: “তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।” (সূরা আলে ইমরান: ১১০)
আজ মুসলিম উম্মাহ সংখ্যায় প্রায় দুইশ কোটিরও বেশি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—শক্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা বিভক্ত, দুর্বল এবং নানা সংকটে আক্রান্ত। কেন?
আজকের আলোচনায় আমরা উম্মাহর বর্তমান কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং সেগুলো থেকে উত্তরণের ইসলামী পথ নিয়ে আলোচনা করব।
বর্তমান যুগে মানুষের বাহ্যিক উন্নতি হয়েছে, কিন্তু ঈমানী শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। নামাজ, কুরআন, যিকির, দোআ—এসব থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে আল্লাহর সাহায্যও কমে যাচ্ছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
অর্থ: “তোমরা যদি আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য কর, তবে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপ দৃঢ় করে দেবেন।” (সূরা মুহাম্মাদ: ৭)
উম্মাহর বিজয়ের প্রথম শর্ত হলো ঈমান ও তাকওয়া।
আজ মুসলমানরা জাতি, ভাষা, দল, গোত্র ও রাজনৈতিক মতভেদে বিভক্ত।
আল্লাহ বলেন—
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
অর্থ: “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।”
(সূরা আলে ইমরান: ১০৩)
রাসূল ﷺ বলেছেন—
الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا
অর্থ: “একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি সুদৃঢ় ভবনের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
অনেক মুসলমান কুরআন তিলাওয়াত করেন না, অর্থ বোঝেন না এবং জীবনে বাস্তবায়ন করেন না।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
অর্থ: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন এগুলো আঁকড়ে ধরবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।”
বর্তমান যুগে অশ্লীলতা, সুদ, মিথ্যা, দুর্নীতি, ঘুষ, ব্যভিচার, মাদক এবং সামাজিক অবক্ষয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الْأَخْلَاقِ
অর্থ: “আমাকে উত্তম চরিত্র পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই প্রেরণ করা হয়েছে।” (মুসনাদ আহমাদ)
যে সমাজ চরিত্র হারায়, সে সমাজ সম্মানও হারায়।
আজ অনেক মুসলমান দুনিয়ার শিক্ষা অর্জন করলেও ইসলামের মৌলিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
অর্থ: “জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ।”
দ্বীনি জ্ঞান ছাড়া সঠিক আমল সম্ভব নয়।
আজকের যুবকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অশ্লীলতা, নেশা, সময় অপচয় এবং ইসলামবিরোধী সংস্কৃতির দ্বারা আক্রান্ত।
অথচ ইসলামের ইতিহাসে যুবকরাই পরিবর্তনের অগ্রদূত ছিলেন।
হযরত আলী (রাঃ), মুসআব ইবন উমাইর (রাঃ), উসামা ইবন যায়েদ (রাঃ)—তাঁরা অল্প বয়সেই ইসলামের জন্য অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার। কিন্তু অনেকেই তাদের কষ্ট অনুভব করি না।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ الْوَاحِدِ، إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
অর্থ: “মুমিনরা পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের ন্যায়। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে পুরো দেহ তা অনুভব করে।” (সহীহ মুসলিম)
উম্মাহর সংকট থেকে মুক্তির জন্য আমাদের করণীয়—
খাঁটি তাওহীদ ও সহীহ আকীদা গ্রহণ করা।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রতিষ্ঠা করা।
নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, অর্থ বোঝা ও আমল করা।
সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
ইলম অর্জন ও অন্যদের শিক্ষা দেওয়া।
যুবসমাজকে ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলা।
মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
দাওয়াত, তাযকিয়া ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে সমাজ সংস্কার করা।
আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা, ইস্তিগফার ও দোআ করা।
প্রিয় মুসল্লিগণ!
উম্মাহর সমস্যা কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি ঈমান, আমল, চরিত্র এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের সমস্যাও। ব্যক্তি যদি সংশোধিত হয়, পরিবার সংশোধিত হবে; পরিবার সংশোধিত হলে সমাজ এবং উম্মাহও পরিবর্তিত হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
অর্থ: “আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সূরা আর-রা’দ: ১১)
আসুন, আমরা নিজেদের ঈমান, আমল, চরিত্র ও দ্বীনি দায়িত্বের প্রতি যত্নবান হই এবং আল্লাহর নিকট উম্মাহর কল্যাণ, ঐক্য ও বিজয়ের জন্য আন্তরিক দোআ করি।
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ، وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.