আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

শূরা ভিত্তিক কাজের গুরুত্ব

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أما بعد،

সম্মানিত উপস্থিত ভাই ও বোনেরা,
আজকের আলোচনার বিষয় “শূরা ভিত্তিক কাজের গুরুত্ব”।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সংগঠন—সকল ক্ষেত্রেই পরামর্শ (শূরা) একটি মৌলিক নীতি। যে সংগঠন শূরার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, সেখানে বরকত, ঐক্য, ন্যায়বিচার ও স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যেখানে একক সিদ্ধান্ত, স্বেচ্ছাচারিতা ও অহংকার প্রাধান্য পায়, সেখানে বিভেদ ও দুর্বলতা সৃষ্টি হয়।


শূরা কী?

শূরা (الشورى) শব্দের অর্থ হলো—
পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

ইসলামে শূরা কেবল একটি প্রশাসনিক পদ্ধতি নয়; বরং এটি একটি ইবাদতস্বরূপ সুন্নাহ।


প্রথম দলিল: কুরআনের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ

অর্থ:“তাদের সকল কাজ পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।”(সূরা আশ-শূরা: ৩৮)

এই আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে শূরার কথা উল্লেখ করেছেন।


দ্বিতীয় দলিল

আল্লাহ তাআলা রাসূল ﷺ-কে নির্দেশ দিয়েছেন—

وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ

অর্থ:“আপনি তাদের সঙ্গে কাজের বিষয়ে পরামর্শ করুন।”(সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)

লক্ষ্য করুন—

যিনি আল্লাহর ওহীর মাধ্যমে পরিচালিত নবী, তাকেও আল্লাহ শূরার নির্দেশ দিয়েছেন।

তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য শূরার গুরুত্ব কত বেশি!


রাসূল ﷺ-এর আমলে শূরা

রাসূল ﷺ ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা।

তবুও তিনি সাহাবীদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করতেন।

বদর যুদ্ধ

কোথায় অবস্থান নেওয়া হবে—

হুবাব ইবনে মুনযির (রাঃ)-এর পরামর্শ গ্রহণ করেন।


উহুদ যুদ্ধ

রাসূল ﷺ-এর ব্যক্তিগত মত ছিল মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ করা।

কিন্তু অধিকাংশ সাহাবীর মত ছিল বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করা।

তিনি নিজের মত ত্যাগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত গ্রহণ করেন।

এটাই শূরার শিক্ষা।


খন্দকের যুদ্ধ

পারস্যের সাহাবী সালমান আল-ফারসি (রাঃ) পরিখা খননের পরামর্শ দেন।

রাসূল ﷺ তা গ্রহণ করেন।

ফলে মুসলমানরা বিশাল বিপদ থেকে রক্ষা পান।


হাদিস

রাসূল ﷺ বলেছেন—

مَا خَابَ مَنِ اسْتَخَارَ، وَلَا نَدِمَ مَنِ اسْتَشَارَ

অর্থ:”যে ইস্তিখারা করে সে ব্যর্থ হয় না এবং যে পরামর্শ করে সে অনুতপ্ত হয় না।”

(হাদিসটির অর্থ ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হলেও এর সনদ শক্তিশালী নয়; তাই এটি নসীহত হিসেবে উল্লেখ করা হয়, সহীহ দলিল হিসেবে নয়।)


আরেকটি সহীহ বর্ণনা—

আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন—

مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ مَشُورَةً لِأَصْحَابِهِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ

অর্থ:”আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চেয়ে তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে অধিক পরামর্শকারী আর কাউকে দেখিনি।”(সুনান আত-তিরমিযি)


খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে শূরা

আবু বকর (রাঃ)

বড় বড় সিদ্ধান্তের আগে মুহাজির ও আনসারদের নিয়ে পরামর্শ করতেন।


উমর (রাঃ)

তিনি একটি স্থায়ী শূরা পরিষদ গঠন করেছিলেন।

তিনি বলতেন—

“যে ব্যক্তি মুসলমানদের সঙ্গে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত দেয়, সে নিজেকে এবং অন্যদের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।”


সংগঠনের ক্ষেত্রে শূরার গুরুত্ব

যে সংগঠন ইসলামী আদর্শে পরিচালিত হবে—

সেখানে অবশ্যই—

  • শূরা থাকবে।
  • মতামত গ্রহণ করা হবে।
  • যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে।
  • ব্যক্তিপূজা থাকবে না।
  • সিদ্ধান্ত হবে দলীয়ভাবে।

শূরার উপকারিতা

১. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

কারণ এটি কুরআনের নির্দেশ।


২. ভুল কম হয়।

একজন মানুষের চিন্তায় ভুল হতে পারে।

কিন্তু সম্মিলিত চিন্তায় ভুলের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।


৩. ঐক্য বৃদ্ধি পায়।

সকলেই যখন মতামত দেওয়ার সুযোগ পায়—

তখন সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।


৪. নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়।

একক নেতৃত্ব নয়—

সম্মিলিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।


৫. অহংকার দূর হয়।

শূরা মানুষকে বিনয়ী করে।


শূরার আদব

শূরা সফল করতে হলে—

১. কুরআন-সুন্নাহকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড মানতে হবে।

২. যোগ্য লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

৩. ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়—

উম্মাহর কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে।

৪. সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে তা মেনে নিতে হবে।

আল্লাহ বলেন—

فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ

অর্থ:”যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো।”(সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)


বাস্তব উদাহরণ

একটি সংগঠন যদি কোনো শিক্ষা প্রকল্প শুরু করতে চায়—

একজন ব্যক্তি একাই সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হতে পারে।

কিন্তু শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল, মাঠকর্মী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে শূরা করলে—

  • সঠিক পরিকল্পনা হবে,
  • ঝুঁকি কমবে,
  • ব্যয় নিয়ন্ত্রিত হবে,
  • মানুষের উপকার বেশি হবে।

এটাই ইসলামের শিক্ষা।


আমাদের করণীয়

  • পরিবারে শূরা চালু করা।
  • সংগঠনে শূরা প্রতিষ্ঠা করা।
  • মসজিদ কমিটিতে শূরা চালু করা।
  • মতভেদকে শত্রুতা না বানিয়ে আলোচনা করা।
  • সিদ্ধান্ত হলে আন্তরিকভাবে তা বাস্তবায়ন করা।

উপসংহার

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

শূরা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইসলামের একটি মৌলিক নীতি।

যে সংগঠনে শূরা থাকে—

সেখানে আল্লাহর রহমত নাযিল হয়, নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়, ঐক্য সুদৃঢ় হয় এবং কাজে বরকত আসে।

আসুন, আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও আমাদের সকল দাওয়াহ ও সেবামূলক কার্যক্রমে শূরার নীতি প্রতিষ্ঠা করি।

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

অর্থ: “হে আমাদের রব! আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজ সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করে দিন।”

وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ، وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ.

আমীন।