আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

হিসাব-নিকাশের দিন

কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে পূর্ণাঙ্গ জুমার খুতবা

হিসাব-নিকাশের দিন (يوم الحساب) আখিরাতের এমন এক ভয়াবহ ও ন্যায়বিচারের দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে তার ঈমান, কথা, কাজ, সম্পদ, সময় এবং দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। সেই দিন কোনো জুলুম হবে না; প্রত্যেকেই তার আমল অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এই খুতবায় হিসাব-নিকাশের দিনের বাস্তবতা, কুরআনের আয়াত, সহিহ হাদিস, আখিরাতের প্রস্তুতি এবং একজন মুমিনের করণীয় আলোচনা করা হয়েছে।


প্রথম খুতবা

خطبة الحاجة

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ. أما بعد

হে আল্লাহর বান্দাগণ!

আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি।

আজকের খুতবার বিষয়—

হিসাব-নিকাশের দিন

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

আখিরাতের প্রতি ঈমান ইসলামের মৌলিক আকীদার অন্যতম স্তম্ভ। মৃত্যুর পর মানুষ পুনরুত্থিত হবে, আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে এবং তার প্রতিটি কথা, কাজ, নিয়ত ও দায়িত্বের হিসাব দিতে হবে। সেই দিন কোনো অবিচার হবে না; আল্লাহ তাআলা পরিপূর্ণ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রত্যেককে তার কর্মফল প্রদান করবেন।


অণু পরিমাণ আমলেরও হিসাব হবে

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ۝ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴾

অর্থঃ “অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে তাও দেখতে পাবে।” (সূরা আয-যালযাল: ৭–৮)


আমলনামায় সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকবে

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا﴾

অর্থঃ “আর আমলনামা উপস্থিত করা হবে। তখন অপরাধীদের দেখবে, তাতে যা আছে তার কারণে তারা ভীত হয়ে বলবে—হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কেমন কিতাব, যা ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ দেয়নি; সবকিছুই লিপিবদ্ধ করেছে।” (সূরা আল-কাহফ: ৪৯)


কোনো গোপন বিষয় গোপন থাকবে না

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَىٰ مِنْكُمْ خَافِيَةٌ﴾

অর্থঃ “সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে; তোমাদের কোনো গোপন বিষয়ই গোপন থাকবে না।” (সূরা আল-হাক্কাহ: ১৮)


সর্বপ্রথম হিসাব হবে সালাতের

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ الصَّلَاةُ»

অর্থঃ “কিয়ামতের দিন বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে।” (জামে আত-তিরমিজি, সুনান আবু দাউদ)


যেসব বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ، وَعَنْ عِلْمِهِ مَاذَا عَمِلَ بِهِ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَا أَبْلَاهُ»

অর্থঃ “কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে, তার জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার শরীর কী কাজে ব্যবহার করেছে—এসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (জামে আত-তিরমিজি)

أقول قولي هذا وأستغفر الله لي ولكم ولسائر المسلمين، فاستغفروه إنه هو الغفور الرحيم.


দ্বিতীয় খুতবা

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

হিসাব-নিকাশের দিনের কথা স্মরণ করলে একজন মুমিনের অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয় এবং সে নিজের আমল সংশোধনের চেষ্টা করে। তাই প্রতিদিন আত্মসমালোচনা (মুহাসাবাহ) করা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।


আখিরাতের জন্য প্রস্তুতির নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ﴾

অর্থঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে যে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।” (সূরা আল-হাশর: ১৮)


নাজাত লাভের উপায়

  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায় করা।
  • কুরআন তিলাওয়াত ও তা অনুযায়ী আমল করা।
  • নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
  • হালাল উপার্জন করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা।
  • মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করা।
  • যাকাত, সদকা ও মানবকল্যাণে অংশগ্রহণ করা।
  • প্রতিদিন আত্মসমালোচনা (মুহাসাবাহ) করা।
  • বেশি বেশি আল্লাহর জিকির ও দোয়া করা।

মুফলিস (দেউলিয়া) ব্যক্তির সতর্কতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ؟ … يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا… فَيُؤْخَذُ مِنْ حَسَنَاتِهِ فَتُعْطَى لَهُمْ»

অর্থঃ “তোমরা কি জানো, প্রকৃত নিঃস্ব (মুফলিস) কে? … সে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও ওপর অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করেছে… তখন তার নেক আমল নিয়ে তাদেরকে দেওয়া হবে।” (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শুধু ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়; মানুষের হক আদায় করাও মুক্তির অন্যতম শর্ত।


দোয়া

اللَّهُمَّ حَاسِبْنَا حِسَابًا يَسِيرًا، وَيَسِّرْ لَنَا الْوُقُوفَ بَيْنَ يَدَيْكَ، وَثَقِّلْ مَوَازِينَ حَسَنَاتِنَا، وَاغْفِرْ ذُنُوبَنَا، وَاجْعَلْ كِتَابَنَا فِي أَيْمَانِنَا، وَأَدْخِلْنَا الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ.

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাদের হিসাব সহজ করে দিন, আপনার সামনে উপস্থিত হওয়া সহজ করে দিন, আমাদের নেক আমলের পাল্লা ভারী করে দিন, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, আমাদের আমলনামা ডান হাতে দিন এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য দান করুন।

اللَّهُمَّ إِنَّا نَعُوذُ بِكَ مِنْ خِزْيِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ.

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ، وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ، الْأَحْيَاءِ مِنْهُمْ وَالْأَمْوَاتِ.

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ


সমাপনী আয়াত

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

فَاذْكُرُوا اللَّهَ يَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوهُ عَلَى نِعَمِهِ يَزِدْكُمْ، وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ. وأقم الصلاة


উপসংহার

প্রিয় মুসল্লিগণ! হিসাব-নিকাশের দিন এমন একটি দিন, যেদিন ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা বংশগৌরব কোনো উপকারে আসবে না। উপকারে আসবে কেবল বিশুদ্ধ ঈমান, ইখলাসপূর্ণ ইবাদত, নেক আমল এবং মানুষের হক আদায়। তাই আসুন, আমরা আজ থেকেই নিজেদের আমলের হিসাব নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলি, সালাত, কুরআন, তাওবা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবকল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবন পরিচালনা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের হিসাব সহজ করুন, আমাদের আমলনামা ডান হাতে দান করুন, আমাদের মীযানের পাল্লা নেক আমলে ভারী করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। আমীন।