আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ

প্রথম খুতবা

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.

أما بعد،

হে ঈমানদারগণ! আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি।

আজকের খুতবার বিষয়— “সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ” (আল-আমরু বিল-মা‘রূফ ওয়ান-নাহই ‘আনিল মুনকার)।

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

ইসলামের অন্যতম মহান বৈশিষ্ট্য হলো—মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। এটি শুধু আলেমদের দায়িত্ব নয়; বরং প্রত্যেক মুসলিম তার জ্ঞান, সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী এ দায়িত্ব পালন করবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾

অর্থ: “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। তারাই সফলকাম।”
(সূরা আলে ইমরান: ১০৪)

আরও বলেন—

﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ﴾

অর্থ: “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ।”
(সূরা আলে ইমরান: ১১০)

রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ

রাসূল ﷺ বলেছেন—

«مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ»

অর্থ: “তোমাদের কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ দেখতে পায়, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে মুখের মাধ্যমে নিষেধ করে। তাও সম্ভব না হলে অন্তরে তা ঘৃণা করে। আর এটিই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।”
(সহিহ মুসলিম)

সৎকাজের আদেশের ক্ষেত্র

  • সালাত, রোজা ও যাকাতের প্রতি উৎসাহিত করা।
  • কুরআন শিক্ষা ও সুন্নাহর অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করা।
  • সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দেওয়া।
  • পরিবারে ইসলামী পরিবেশ গড়ে তোলা।
  • সমাজে ন্যায়বিচার, দয়া ও সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।

অসৎকাজ থেকে নিষেধের ক্ষেত্র

  • শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার থেকে সতর্ক করা।
  • মিথ্যা, গীবত, সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
  • অশ্লীলতা, মাদক ও অন্যায়-অবিচার থেকে মানুষকে বিরত রাখা।
  • পারিবারিক ও সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।

أقول قولي هذا وأستغفر الله لي ولكم ولسائر المسلمين، فاستغفروه إنه هو الغفور الرحيم.


দ্বিতীয় খুতবা

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পালন করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব মেনে চলতে হবে।

দাওয়াত ও নসিহতের আদব

  • কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন করে কথা বলা।
  • নম্রতা, প্রজ্ঞা ও সুন্দর ভাষা ব্যবহার করা।
  • অপমান বা কঠোরতার পরিবর্তে আন্তরিক নসিহত করা।
  • নিজের জীবনে আগে সেই আমল বাস্তবায়ন করা।
  • ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾

অর্থ: “তোমার প্রতিপালকের পথে মানুষকে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।”
(সূরা আন-নাহল: ১২৫)

অবহেলার পরিণতি

রাসূল ﷺ বলেছেন—

«إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الظَّالِمَ فَلَمْ يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابٍ مِنْهُ»

অর্থ: “মানুষ যখন কোনো জালিমকে অন্যায় করতে দেখে, অথচ তাকে বাধা দেয় না, তখন অচিরেই আল্লাহ তাদের সবাইকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারেন।”
(সুনান আবু দাউদ, জামে আত-তিরমিজি)

আমাদের করণীয়

  • নিজের পরিবার থেকেই দাওয়াত ও নসিহত শুরু করা।
  • সন্তানদের সৎকাজে উৎসাহিত করা।
  • মসজিদ, মাদরাসা ও সমাজে কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা।
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্য ও উপকারী বিষয় প্রচার করা।
  • অন্যায় দেখলে শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে যথাযথভাবে প্রতিবাদ করা।
  • সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে উদ্দেশ্য করা।

দোয়া

اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الآمِرِينَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهِينَ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَارْزُقْنَا الْحِكْمَةَ وَالإِخْلَاصَ وَالثَّبَاتَ عَلَى دِينِكَ.

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদেরকে সৎকাজের আদেশদানকারী ও অসৎকাজ থেকে নিষেধকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমাদেরকে প্রজ্ঞা, ইখলাস এবং আপনার দীনের ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন।

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ. إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ. فَاذْكُرُوا اللَّهَ الْعَظِيمَ يَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوهُ عَلَى نِعَمِهِ يَزِدْكُمْ، وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ. وأقم الصلاة.

খতিবের জন্য উপসংহার

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি। যখন মুসলিম সমাজ এই দায়িত্ব পালন করে, তখন ন্যায়বিচার, শান্তি ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যখন এই দায়িত্ব অবহেলা করা হয়, তখন অন্যায়, ফিতনা ও অবক্ষয় সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আসুন, আমরা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করি এবং সকল অন্যায় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মহান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।