
সুদের ভয়াবহতা ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসে সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। সুদ শুধু একজন ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; বরং এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইসলাম মানুষকে হালাল উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছে এবং হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ হালাল রিজিকে রয়েছে বরকত, শান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। পক্ষান্তরে হারাম উপার্জন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আজকের জুমার খুতবার বিষয় হলো:
“সুদের ভয়াবহতা: কুরআন ও হাদিসের আলোকে সুদের ক্ষতি ও পরিণতি”
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أما بعد، فَإِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ ﷺ، وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ، وَكُلَّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ.أما بعد،
হে আল্লাহর বান্দাগণ!
আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি। তাকওয়া অবলম্বন করুন। কারণ তাকওয়াই হলো দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার মূল চাবিকাঠি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
অর্থ:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।”
(সূরা আলে ইমরান: ১০২)
সম্মানিত মুসল্লিগণ!
সুদ বা রিবা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি মারাত্মক কবিরা গুনাহ। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের সম্পদ, অধিকার ও ন্যায়বিচার সংরক্ষণ করা হয়েছে। সুদ এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্যের প্রয়োজন ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে ধনী আরও ধনী হয় এবং দরিদ্র আরও সংকটে পড়ে। ইসলাম ব্যবসাকে বৈধ করেছে, কিন্তু সুদকে হারাম করেছে। কারণ ব্যবসার মধ্যে পরিশ্রম, ঝুঁকি ও পারস্পরিক উপকার রয়েছে; পক্ষান্তরে সুদের মধ্যে রয়েছে শোষণ ও অন্যায় সুবিধা গ্রহণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ
অর্থ:
“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন এমনভাবে দাঁড়াবে, যেমন শয়তানের স্পর্শে বিকারগ্রস্ত ব্যক্তি দাঁড়ায়।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সুদের কাজ কত ভয়াবহ যে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের কঠিন পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে তা বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
অর্থ:
“আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৬)
অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে সুদের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এতে বরকত থাকে না। পক্ষান্তরে সদকা ও দানের মাধ্যমে আল্লাহ সম্পদে বরকত দান করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
অর্থ:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যদি তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৮-২৭৯)
সম্মানিত মুসল্লিগণ!
চিন্তা করুন, পৃথিবীর কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে মানুষ কতটা ভীত হয়। অথচ এখানে ঘোষণা এসেছে স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে। এটি সুদের ভয়াবহতার বড় প্রমাণ।
সম্মানিত মুসল্লিগণ!
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদের ব্যাপারে উম্মতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি শুধু সুদ গ্রহণকারীকে নয়, বরং সুদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সকল ব্যক্তিকে সতর্ক করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ»
অর্থ:
“রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের চুক্তি লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়ের ওপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই (গুনাহের ক্ষেত্রে) সমান।” (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সুদ শুধু গ্রহণ করাই নয়; বরং সুদের কাজে সহযোগিতা করাও ভয়াবহ অপরাধ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ»
অর্থ:
“তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এই ধ্বংসকারী গুনাহগুলোর মধ্যে রাসূল ﷺ সুদ গ্রহণের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
প্রিয় মুসল্লিগণ!
যে গুনাহকে রাসূল ﷺ ধ্বংসকারী গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সেই গুনাহ থেকে প্রত্যেক মুসলমানের সতর্ক থাকা আবশ্যক।
সুদ আল্লাহর বিধানের বিরোধী। একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আর যে কাজ আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তা থেকে বেঁচে থাকা ঈমানের দাবি।
অনেক সময় দেখা যায়, সুদের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পেলেও সেই সম্পদে শান্তি থাকে না। পরিবারে অশান্তি, দুশ্চিন্তা ও বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا
অর্থ:
“আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৬)
সুদভিত্তিক ব্যবস্থা সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ায়। একজন অসহায় ব্যক্তি প্রয়োজনের সময় ঋণ নেয়, কিন্তু সুদের কারণে সে আরও বেশি সমস্যায় পড়ে যায়।
ইসলাম মানুষের প্রতি দয়া, সহযোগিতা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ হালাল খাদ্য ও হালাল উপার্জনের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন।
যে ব্যক্তির খাদ্য, পোশাক ও উপার্জন হারাম দ্বারা গঠিত হয়, তার দোয়া কবুল হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি হয়।
তাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো নিজের উপার্জনের উৎস যাচাই করা।
সম্মানিত মুসল্লিগণ!
বর্তমান সময়ে সুদ বিভিন্ন নামে সমাজে প্রচলিত রয়েছে। যেমন—
একজন মুসলমানের উচিত এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং সন্দেহজনক লেনদেন থেকে দূরে থাকা।
যেসব আধুনিক আর্থিক বিষয়ের বিধান স্পষ্টভাবে জানা নেই, সেসব বিষয়ে বিশ্বস্ত ও যোগ্য আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা হালাল রিজিকের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। অল্প হলেও হালাল উপার্জনে বরকত রয়েছে।
ব্যবসা, ঋণ, বিনিয়োগ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা জানা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের জন্য ঋণের ওপর নির্ভর না করে সহজ-সরল জীবনযাপন করা উচিত।
যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং হালাল পথে থাকার চেষ্টা করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেন।
সদকা সম্পদ কমায় না; বরং আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
অর্থ:
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলাম বৈধ ব্যবসা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জনকে উৎসাহিত করেছে এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে।
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.
أما بعد،
হে আল্লাহর বান্দাগণ!
আবারও আমি আপনাদের তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি।
সম্মানিত মুসল্লিগণ!
সুদ এমন একটি গুনাহ, যার ভয়াবহতা কুরআন ও হাদিসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের জীবন, ব্যবসা ও আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করা।
আমাদের দেখতে হবে—
আমাদের উপার্জন কি হালাল?
আমাদের ব্যবসায় কোনো হারাম বিষয় আছে কি?
আমাদের ঋণ বা বিনিয়োগে সুদের সম্পর্ক রয়েছে কি?
কারণ একজন মুমিনের পরিচয় হলো, সে আল্লাহর বিধানকে নিজের জীবনের ওপর প্রাধান্য দেয়।
اللَّهُمَّ اكْفِنَا بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنَا بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ، وَبَارِكْ لَنَا فِي أَرْزَاقِنَا، وَجَنِّبْنَا الرِّبَا وَكُلَّ مَا يُغْضِبُكَ
অর্থ:
হে আল্লাহ! আপনার হালালের মাধ্যমে আমাদেরকে হারাম থেকে রক্ষা করুন। আপনার অনুগ্রহে আমাদেরকে অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে মুক্ত রাখুন। আমাদের রিজিকে বরকত দান করুন এবং সুদ ও আপনার অসন্তুষ্টির সকল কাজ থেকে আমাদের দূরে রাখুন।
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ:
হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
অর্থ:
“নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়দের দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।”
فَاذْكُرُوا اللَّهَ يَذْكُرْكُمْ، وَاشْكُرُوهُ عَلَى نِعَمِهِ يَزِدْكُمْ، وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ، وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ
সম্মানিত মুসল্লিগণ!
সুদ এমন একটি ভয়াবহ গুনাহ, যার বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত হালাল উপার্জনের প্রতি যত্নবান হওয়া, সুদের সব পথ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল রিজিক দান করুন, হারাম থেকে রক্ষা করুন, আমাদের সম্পদে বরকত দিন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা দান করুন।
آمين يا رب العالمين
We use cookies to improve your experience on our site. By using our site, you consent to cookies.
Manage your cookie preferences below:
Essential cookies enable basic functions and are necessary for the proper function of the website.
These cookies are needed for adding comments on this website.
These cookies are used for managing login functionality on this website.
Statistics cookies collect information anonymously. This information helps us understand how visitors use our website.
Google Analytics is a powerful tool that tracks and analyzes website traffic for informed marketing decisions.
Service URL: policies.google.com (opens in a new window)
Marketing cookies are used to follow visitors to websites. The intention is to show ads that are relevant and engaging to the individual user.
Google Maps is a web mapping service providing satellite imagery, real-time navigation, and location-based information.
Service URL: policies.google.com (opens in a new window)
You can find more information in our Cookie Policy and .