আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

সালাতের গুরুত্ব ও খুশু-খুযু

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি দাওয়াতী আলোচনা

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

إِنَّ الْحَمْدَ لِلّٰهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللّٰهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، أَمَّا بَعْدُ।

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই সাহায্য চাই, তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের নফসের অনিষ্ট ও আমাদের কৃতকর্মের অকল্যাণ থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। যাকে আল্লাহ হিদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ হিদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল।

সম্মানিত উপস্থিত মুসল্লিবৃন্দ, প্রিয় ঈমানদার ভাই ও বোনেরা!

আপনাদের সকলকে তাকওয়া অবলম্বনের অসিয়ত করছি। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করুন, তাঁর আদেশ পালন করুন এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকুন। কারণ দুনিয়ার জীবন অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী।

আজকের আলোচনার বিষয়—“সালাতের গুরুত্ব ও খুশু-খুযু”।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

একজন মুসলমানের জীবনে ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সালাত। এটি এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহ তাআলা মিরাজের রজনীতে সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দান করেছেন। অন্য সব বিধান ওহির মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে, কিন্তু সালাতের বিধান এসেছে আসমানে। এ থেকেই সালাতের মর্যাদা বোঝা যায়।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বারবার সালাত প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন—

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ

অর্থ: “তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত আদায় কর।” (সূরা আল-বাকারা: ৪৩)

এখানে আল্লাহ “সালাত পড়ো” বলেননি; বলেছেন “সালাত প্রতিষ্ঠা কর”। অর্থাৎ সালাতকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ… وَإِقَامِ الصَّلَاةِ

অর্থ: “ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত, যার অন্যতম হলো সালাত প্রতিষ্ঠা করা।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

অতএব, সালাত ছাড়া একজন মুসলমানের জীবন পূর্ণ হতে পারে না।

প্রিয় উপস্থিতি,

আজ আমরা দুনিয়ার কাজের জন্য কত ব্যস্ত! ব্যবসা, চাকরি, পড়াশোনা, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব কিছুর জন্য সময় আছে; কিন্তু যখন আজান হয়, তখন অনেকেই মনে করেন, “আরেকটু পরে পড়ব।” এই “আরেকটু পরে” বলতে বলতে কখন যে সালাত কাজা হয়ে যায়, আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না।

একবার চিন্তা করুন—যিনি আমাদের জীবন দিয়েছেন, রিজিক দিয়েছেন, সুস্থতা দিয়েছেন, পরিবার দিয়েছেন, সেই মহান রব দিনে মাত্র পাঁচবার আমাদের ডাকেন। প্রতিটি সালাতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। অথচ আমরা সেই ডাকে সাড়া দিতে কত অবহেলা করি!

রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সালাত ত্যাগের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন—

إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلَاةِ

অর্থ: “মানুষ ও শিরক-কুফরের মাঝখানে রয়েছে সালাত ত্যাগ করা।” (সহীহ মুসলিম)

এ হাদিস আমাদেরকে ভীত করে এবং সতর্ক করে। তাই সালাতকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যে আমলের হিসাব নেবেন, তা হলো সালাত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الصَّلَاةُ

অর্থ: “কিয়ামতের দিন বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে সালাতের। যদি সালাত ঠিক থাকে, তবে অন্যান্য আমলও গ্রহণযোগ্য হওয়ার আশা করা যায়; আর যদি সালাত নষ্ট হয়, তবে অন্যান্য আমলও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিন নিজের সালাতের হিসাব নেওয়া।

ভাই ও বোনেরা,

সালাত কেবল কিছু রুকু-সিজদার নাম নয়। সালাতের উদ্দেশ্য হলো মানুষের চরিত্রকে পরিবর্তন করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ

অর্থ: “নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৫)

যদি আমাদের সালাত পড়ার পরও মিথ্যা, গীবত, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ, অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকতে না পারি, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে—আমাদের সালাতে কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে।

এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় কারণ হলো খুশু-খুযুর অভাব।

আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে সর্বপ্রথম বলেছেন—

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ ۝ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ

অর্থ: “নিশ্চয়ই সফল হয়েছে সেই মুমিনরা, যারা তাদের সালাতে খুশু-খুযু অবলম্বন করে।” (সূরা আল-মু’মিনূন: ১-২)

খুশু অর্থ হলো—অন্তরের বিনয়, আল্লাহর ভয়, ভালোবাসা এবং একাগ্রতা নিয়ে সালাত আদায় করা।

আজ অনেক মানুষ সালাত পড়ে, কিন্তু মন থাকে ব্যবসায়, চাকরিতে, মোবাইলে কিংবা পারিবারিক চিন্তায়। জিহ্বা কুরআন তিলাওয়াত করছে, কিন্তু হৃদয় অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন সালাত আমাদের আত্মাকে পরিবর্তন করতে পারে না।

তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে, সালাতে দাঁড়ানোর সময় মনে করা—এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ সালাত। হয়তো এর পরে আর কোনো সালাত পড়ার সুযোগ পাব না। যখন এই অনুভূতি অন্তরে সৃষ্টি হবে, তখন সালাতে একাগ্রতা অনেক বেড়ে যাবে।

আমাদের সালাতে খুশু-খুযু অর্জনের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে অনুসরণ করা দরকার।

প্রথমত, সালাতে যা পড়ছি তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আমরা প্রতিদিন সূরা ফাতিহা পড়ি, তাসবীহ পড়ি, তাশাহহুদ পড়ি; কিন্তু অনেকেই এর অর্থ জানি না। যখন আমরা বুঝে বুঝে তিলাওয়াত করব, তখন অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।

দ্বিতীয়ত, সুন্নাহ অনুযায়ী ধীরে-সুস্থে সালাত আদায় করতে হবে। অনেকেই খুব দ্রুত সালাত শেষ করেন, যেন কোনো দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ ধীরস্থিরভাবে রুকু, সিজদা ও কিয়াম করতেন। তিনি এক ব্যক্তিকে তিনবার সালাত পুনরায় পড়তে বলেছিলেন এবং বলেছেন, “তুমি সালাত পড়নি।” (সহীহ বুখারী)। কারণ সে তাড়াহুড়ো করে সালাত আদায় করেছিল।

তৃতীয়ত, সালাতে দাঁড়িয়ে মনে করতে হবে—আমি মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। যিনি আসমান-জমিনের মালিক, যিনি আমার সব কথা, সব চিন্তা ও সব গোপন বিষয় জানেন, আমি তাঁর সাথেই কথা বলছি।

চতুর্থত, সালাতের আগে দুনিয়াবি ব্যস্ততা কমিয়ে মনকে প্রস্তুত করতে হবে। আজান শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওযু করে সময়মতো মসজিদে চলে আসা উচিত। মোবাইল ফোন নীরব রাখা, অপ্রয়োজনীয় চিন্তা দূরে রাখা এবং আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে হবে। আমরা জানি না, এই সালাতই হয়তো জীবনের শেষ সালাত। যদি এমন অনুভূতি নিয়ে সালাত আদায় করি, তাহলে খুশু-খুযু অনেক বেড়ে যাবে।

সম্মানিত উপস্থিতি,

রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) সালাতে এমন একাগ্র থাকতেন যে, তারা দুনিয়ার সবকিছু ভুলে যেতেন। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, কেউ কেউ সালাতরত অবস্থায় আহত হয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর ইবাদতে এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে, ব্যথা অনুভব করেননি। তাঁদের হৃদয় ছিল আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ। তাই তাদের সালাত তাদের চরিত্র, ঈমান এবং জীবনে অসাধারণ পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।

আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা দরকার—

  • আমার পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কি সময়মতো আদায় হয়?
  • আমি কি জামাতে সালাত আদায়ের চেষ্টা করি?
  • সালাতে দাঁড়ালে আমার মন কোথায় থাকে?
  • আমার সালাত কি আমাকে গুনাহ থেকে বিরত রাখছে?
  • আমার সন্তানরা কি নিয়মিত সালাত আদায় করছে?

যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক না হয়, তাহলে আজ থেকেই নিজেকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

এই দুনিয়ার জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। একদিন আমাদের সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি, পদ-পদবি—কোনো কিছুই আমাদের সঙ্গে যাবে না। কবর পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে যাবে কেবল আমাদের ঈমান, নেক আমল এবং সালাত।

তাই আসুন, আমরা আজ থেকেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি—

  • কোনো অবস্থাতেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ছাড়ব না।
  • সময়মতো সালাত আদায় করব।
  • যথাসম্ভব জামাতে সালাত আদায় করব।
  • সালাতে খুশু-খুযু অর্জনের চেষ্টা করব।
  • স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সবাইকে সালাতের প্রতি উৎসাহিত করব।
  • আমাদের ঘরকে সালাত ও কুরআনের আলোয় আলোকিত করব।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا

অর্থ: “আপনি আপনার পরিবারকে সালাতের নির্দেশ দিন এবং এর ওপর দৃঢ় থাকুন।” (সূরা ত্ব-হা: ১৩২)

সুতরাং নিজের সালাত ঠিক করার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেও সালাত প্রতিষ্ঠার দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।

আসুন, আমরা সবাই আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করি—

اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْمُقِيمِينَ الصَّلَاةَ، وَمِنَ الْخَاشِعِينَ فِيهَا، وَاجْعَلْهَا قُرَّةَ أَعْيُنِنَا، وَاغْفِرْ لَنَا وَلِوَالِدِينَا وَلِجَمِيعِ الْمُسْلِمِينَ، وَثَبِّتْ قُلُوبَنَا عَلَى دِينِكَ، وَتَوَفَّنَا عَلَى الْإِيمَانِ وَالْإِسْلَامِ.

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদেরকে সালাত প্রতিষ্ঠাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমাদের সালাতে খুশু-খুযু দান করুন। সালাতকে আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন। আমাদের, আমাদের পিতা-মাতা এবং সকল মুসলিমকে ক্ষমা করুন। আমাদের অন্তরকে আপনার দীনের ওপর অবিচল রাখুন এবং ঈমান ও ইসলামের ওপর মৃত্যু দান করুন।

আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।

وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ