সময়ের সঠিক ব্যবহার
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمداً عبده ورسوله.
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি আমাদের জীবন, সময় ও সুযোগ দান করেছেন। দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
সময়ের মতো মূল্যবান নিয়ামত আর কিছু নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে এই সময়কেই। টাকা হারালে মানুষ কাঁদে, সম্পদ হারালে দুঃখ করে, কিন্তু সময় হারালে অধিকাংশ মানুষ অনুতপ্তও হয় না—যদিও সময়ই জীবনের মূল সম্পদ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ…
“সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, তবে তারা নয় যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে…” (সূরা আল-আস্র: ১–৩)
এই ছোট সূরাটি পুরো মানবজীবনের সারসংক্ষেপ। সময়ের সঠিক ব্যবহার ছাড়া কোনো মুক্তি নেই।
নবী ﷺ সময়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি বলেছেন—
نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
“দুটি নিয়ামত এমন আছে, যা সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় আছে—স্বাস্থ্য এবং অবসর সময়।” (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ মানুষ বুঝতেই পারে না, সময় ও সুস্থতা কত বড় সম্পদ, যতক্ষণ না তা হারিয়ে যায়।
আরেক হাদিসে নবী ﷺ বলেন—
اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ: شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ…
“পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের আগে গনীমত মনে করো—তোমার যৌবনকে বৃদ্ধ হওয়ার আগে…” (হাকিম)
আমরা কেন সময় নষ্ট করি? কয়েকটি বড় কারণ হলো:
১. অলসতা ও গাফলতি
২. অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যম
৩. পরিকল্পনার অভাব
৪. ভবিষ্যতের প্রতি উদাসীনতা
৫. দুনিয়াবি কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আখিরাতকে ভুলে যাওয়া
আজকের যুগে সবচেয়ে বড় সময় চোর হলো মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়া। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করে, কিন্তু দিনের শেষে মনে হয়—“আজ আমি কী করলাম?”
ইসলামের দৃষ্টিতে সময় ব্যবহারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি আছে:
নবী ﷺ বলেছেন—
إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلَاةِ فَصَلِّ صَلَاةَ مُوَدِّعٍ
অর্থাৎ এমনভাবে কাজ করো যেন এটি তোমার শেষ কাজ।
একজন মুসলমানের উচিত প্রতিদিনের জন্য একটি ছোট পরিকল্পনা থাকা—নামাজ, কাজ, শিক্ষা, পরিবার এবং ইবাদত।
সব কাজের আগে ফরজ ইবাদত।
নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, হালাল রিজিক—এসবকে কখনো পিছিয়ে দেওয়া যাবে না।
আল্লাহ বলেন—
إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا
“নিশ্চয়ই নামাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফরজ করা হয়েছে।”
(সূরা নিসা: ১০৩)
নবী ﷺ বলেছেন—
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
“মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হলো এমন বিষয় ত্যাগ করা যা তার জন্য অপ্রয়োজনীয়।”
(তিরমিজি)
একজন ছাত্র যদি দিনে ৫–৬ ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখে, তাহলে তার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, যে ছাত্র প্রতিদিন ২–৩ ঘণ্টা পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনা করে, সে অল্প সময়েই সফল হতে পারে।
ইমাম ইবনুল জাওজি রহ. বলেন—
“আমি এমন সময়ের কথা জানি, যখন আমার কাছে সময় এত মূল্যবান ছিল যে, আমি এক মুহূর্তও অপচয় করতে পারতাম না।”
সালাফে সালেহীন সময়ের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন।
ইমাম হাসান আল-বসরী রহ. বলেছেন—
“হে আদম সন্তান! তুমি তো সময়েরই একটি অংশ, যখনই একটি দিন চলে যায়, তোমার জীবনও কমে যায়।”
তারা রাতকে ভাগ করতেন—এক অংশ ইবাদত, এক অংশ বিশ্রাম, এক অংশ জ্ঞান অর্জন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে সে আগামীকালের জন্য কী প্রস্তুতি পাঠিয়েছে।”
(সূরা হাশর: ১৮)
“আগামীকাল” এখানে আখিরাতকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সময় হলো আখিরাতের প্রস্তুতির সুযোগ।
১. জীবনে ব্যর্থতা
2. ইবাদত থেকে দূরে সরে যাওয়া
3. মানসিক অস্থিরতা
4. আখিরাতে আফসোস
কুরআনে বলা হয়েছে—
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا
“যখন মৃত্যু এসে যাবে, তখন সে বলবে—হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি।”
(সূরা মুমিনুন: ৯৯–১০০)
কিন্তু তখন আর সময় থাকবে না।
১. দিন শুরু করুন ফজরের নামাজ দিয়ে
২. প্রতিদিনের টু-ডু লিস্ট তৈরি করুন
৩. মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করুন
৪. খারাপ সঙ্গ ও অপ্রয়োজনীয় আড্ডা এড়িয়ে চলুন
৫. প্রতিদিন কুরআন ও দোয়া নির্দিষ্ট সময় পড়ুন
৬. রাতে ঘুমানোর আগে দিনের হিসাব নিন
প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
সময় হলো জীবন। যে সময়কে ভালোভাবে ব্যবহার করে, সে সফল। আর যে সময়কে নষ্ট করে, সে ধ্বংসের পথে চলে যায়।
আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—আজ থেকে আমরা আমাদের সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করব। প্রতিটি মুহূর্তকে আখিরাতের পুঁজি বানাবো।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সময়ের সঠিক মূল্য বুঝার তাওফিক দান করুন।
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين।