আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

রমাদানের প্রস্তুতি ও সাওমের শিক্ষা | পূর্ণাঙ্গ জুমার খুতবা

প্রথম খুতবা

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.

أما بعد، فاتقوا الله عباد الله، فإن تقوى الله خير زاد ليوم المعاد.

সম্মানিত মুসল্লিগণ,

আজকের জুমার খুতবার বিষয় হলো “রমাদানের প্রস্তুতি ও সাওমের শিক্ষা”।

রমাদান এমন একটি বরকতময় মাস, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার ঈমান, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির জন্য নির্ধারণ করেছেন। এই মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।

রমাদানের উদ্দেশ্য

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রোজার মূল উদ্দেশ্য ক্ষুধার কষ্ট ভোগ করা নয়; বরং তাকওয়া অর্জন করা।

রমাদানের আগমনে রাসূল ﷺ-এর প্রস্তুতি

রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের রমাদানের আগমনের সুসংবাদ দিতেন।

তিনি বলেন—

أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ، فَرَضَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ…

অর্থ: “তোমাদের কাছে বরকতময় রমাদান মাস এসেছে। আল্লাহ তোমাদের ওপর এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন।”
সহিহ: Sunan an-Nasa’i, হাদিস নং ২১০৬

রমাদানের জন্য আমাদের প্রস্তুতি

রমাদানের আগে একজন মুসলমানের উচিত—

  • আন্তরিক তওবা করা।

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিয়মিত হওয়া।

  • কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা।

  • হারাম উপার্জন ও গুনাহ থেকে ফিরে আসা।

  • আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা।

  • ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করা।

  • যাকাতের হিসাব প্রস্তুত করা।

  • সেহরি ও ইফতারের অপচয় থেকে বিরত থাকার পরিকল্পনা করা।

সাওমের শিক্ষা

১. তাকওয়ার শিক্ষা

রোজা মানুষকে আল্লাহভীরু করে।

২. ধৈর্যের শিক্ষা

ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে একজন মুমিন ধৈর্যশীল হয়ে ওঠে।

আল্লাহ বলেন—

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৫৩)

৩. আত্মসংযম

রাসূল ﷺ বলেন—

فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ، فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَصْخَبْ…

অর্থাৎ রোজাদার যেন অশ্লীল কথা ও ঝগড়া-বিবাদ না করে।
সহিহ: Sahih al-Bukhari, হাদিস ১৯০৪; Sahih Muslim

৪. দরিদ্রের কষ্ট অনুভব

রোজা ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায়। ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে মানুষ অসহায়দের সাহায্যে উদ্বুদ্ধ হয়।

৫. কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক

আল্লাহ বলেন—

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ

“রমাদান সেই মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)

তাই রমাদান হওয়া উচিত কুরআনের মাস।

একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

একজন সাহাবি রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন—কোন আমল মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যায়?

তিনি উত্তরে বহু নেক আমলের সঙ্গে রোজার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন—

الصَّوْمُ جُنَّةٌ

“রোজা একটি ঢাল।”
সহিহ: Sahih al-Bukhari

রোজা মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে এবং পাপ থেকে বিরত রাখে।


দ্বিতীয় খুতবা

الحمد لله رب العالمين، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله، صلى الله عليه وسلم.

সম্মানিত মুসল্লিগণ,

রমাদানকে সফল করতে আমাদের উচিত—

  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় করা।

  • প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করা।

  • তাহাজ্জুদ ও তারাবিহর প্রতি যত্নবান হওয়া।

  • দান-সদকা বৃদ্ধি করা।

  • যাকাত যথাসময়ে আদায় করা।

  • আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া।

  • গীবত, মিথ্যা, সুদ, ঘুষ ও সকল হারাম কাজ বর্জন করা।

  • বেশি বেশি ইস্তিগফার, তাসবিহ ও দোয়া করা।

  • লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান করা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

অর্থ: “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমাদানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”
সহিহ: Sahih al-Bukhari, হাদিস ৩৮; Sahih Muslim

উপসংহার

হে আল্লাহর বান্দাগণ!

রমাদান কেবল এক মাসের ইবাদতের নাম নয়; এটি সারাজীবনের তাকওয়া, চরিত্র গঠন এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রশিক্ষণ। আমরা যেন রমাদানের পূর্বেই নিজেদের প্রস্তুত করি এবং এই বরকতময় মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজে লাগাই।

দোয়া

اللَّهُمَّ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ، وَأَعِنَّا عَلَى صِيَامِهِ وَقِيَامِهِ، وَتَقَبَّلْ مِنَّا، وَاغْفِرْ لَنَا وَلِوَالِدِينَا وَلِلْمُسْلِمِينَ أَجْمَعِينَ.

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً، وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً، وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ.

وأقم الصلاة.