রমজান মুসলিম জীবনের এক অনন্য প্রশিক্ষণ মাস। এই মাস তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, দানশীলতা ও কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার শিক্ষা দেয়।
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أما بعد:
সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ! আজকের আলোচনার বিষয় “রমজানের শিক্ষা”।
রমজান মাস আমাদের জীবনে শুধু এক মাসের সিয়াম সাধনার নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই মাস আমাদের তাকওয়া, আত্মসংযম, ধৈর্য, দানশীলতা এবং আল্লাহর আনুগত্যের শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” — (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৩)
তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয় ও তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। রোযাদার ব্যক্তি যখন ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করে, তখন সে শেখে যে গোপনে হলেও আল্লাহ তাকে দেখছেন।
একজন রোযাদার ঘরে একা থাকলেও পানি পান করে না। কারণ কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। এটাই তাকওয়ার শিক্ষা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
الصِّيَامُ جُنَّةٌ
অর্থঃ “রোযা হলো ঢাল বা রক্ষাকবচ।” — (সহীহ বুখারী)
রোযা মানুষকে নিজের প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। রাগ, হিংসা, গীবত, মিথ্যা, অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَجْهَلْ
অর্থঃ “তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা ও ঝগড়া-বিবাদ না করে।” — (সহীহ বুখারী)
রমজান হলো কুরআন নাযিলের মাস।
আল্লাহ বলেন—
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ
অর্থঃ “রমজান সেই মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত।” — (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৫)
রমজানের অন্যতম শিক্ষা হলো কুরআন তিলাওয়াত, বুঝা এবং তার উপর আমল করা।
অনেক মানুষ রমজানে প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করে। কিন্তু রমজানের পরে তা ছেড়ে দেয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো সারা বছর কুরআনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।
রোযা মানুষকে ধৈর্য শিখায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
অর্থঃ “ধৈর্যশীলদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।” — (সূরা আয-যুমার: ১০)
ক্ষুধা, পিপাসা ও কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে একজন মুসলিম ধৈর্যের শিক্ষা অর্জন করে।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ
অর্থঃ “রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, আর রমজানে তিনি আরও বেশি দানশীল হতেন।” — (সহীহ বুখারী)
রমজান আমাদের গরিব, অসহায় ও অভাবীদের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখায়।
একজন ক্ষুধার্ত রোযাদার যখন ইফতারের অপেক্ষায় থাকে, তখন সে দরিদ্র মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে এবং তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থঃ “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোযা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”
— (সহীহ বুখারী, মুসলিম)
রমজান গুনাহ থেকে তওবা করে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়।
রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আল্লাহর আনুগত্য কেবল রমজানের জন্য নয়, সারা জীবনের জন্য।
আল্লাহ বলেন—
وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
অর্থঃ “তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাক, যতক্ষণ না তোমার মৃত্যু আসে।”
— (সূরা আল-হিজর: ৯৯)
যদি রমজানের পরে নামাজ, কুরআন, দান-সদকা ও তাকওয়া বজায় থাকে, তাহলে বুঝতে হবে রমজানের শিক্ষা আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি।
প্রিয় মুসল্লীবৃন্দ!
রমজান আমাদের শিখায়—
১. তাকওয়া অর্জন করতে।
২. নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে।
৩. কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়তে।
৪. ধৈর্য ধারণ করতে।
৫. দানশীল হতে।
৬. গুনাহ থেকে তওবা করতে।
৭. সারা বছর আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকতে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে জীবন গঠনের তাওফীক দান করুন।
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْمُتَّقِينَ، وَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا، وَتَقَبَّلْ صِيَامَنَا وَقِيَامَنَا، وَأَعِنَّا عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ.
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ، وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ.
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ। آمين।