আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

যিকির ও দোয়া মুমিনের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কুরআন ও হাদিসের আলোকে যিকিরের ফজিলত, দোয়ার মর্যাদা, দোয়া কবুলের সময় এবং বাস্তব জীবনে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা।

যিকির ও দোয়ার গুরুত্ব

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللّٰهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللّٰهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أما بعد:

সম্মানিত ঈমানদার ভাইয়েরা!

আজকের আলোচনার বিষয় “যিকির ও দোয়ার গুরুত্ব”। যিকির ও দোয়া হলো মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন বান্দা যখন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর কাছে দোয়া করে, তখন সে সরাসরি তার রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে।

যিকিরের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللّٰهَ ذِكْرًا كَثِيرًا ۝ وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর।”
(সূরা আল-আহযাব: ৪১-৪২)

আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন:

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ

অর্থ: “তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৫২)

কত বড় সৌভাগ্যের কথা! আমরা যদি আল্লাহকে স্মরণ করি, আল্লাহও আমাদের স্মরণ করেন।

যিকির অন্তরের প্রশান্তি আনে

আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَلَا بِذِكْرِ اللّٰهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

অর্থ: “জেনে রাখো! আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।”
(সূরা আর-রা’দ: ২৮)

আজ মানুষ অর্থ, সম্পদ ও পদ-পদবী থাকা সত্ত্বেও অশান্তিতে ভুগছে। কারণ অন্তরের শান্তি টাকা দিয়ে কেনা যায় না; তা কেবল আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

যিকিরের ফযীলত সম্পর্কে হাদিস

রাসূল ﷺ বলেন:

مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ

অর্থ: “যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে স্মরণ করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃত ব্যক্তির ন্যায়।”
(সহীহ বুখারী)

অর্থাৎ যিকির মানুষের আত্মাকে জীবিত রাখে।

আরেক হাদিসে রাসূল ﷺ বলেন:

سَبَقَ الْمُفَرِّدُونَ

সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, “মুফাররিদুন কারা?”

তিনি বললেন:

الذَّاكِرُونَ اللّٰهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتُ

অর্থ: “যারা অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করে—পুরুষ ও নারী।”
(সহীহ মুসলিম)

দোয়ার গুরুত্ব

দোয়া হলো ইবাদতের মর্ম।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ

অর্থ: “দোয়াই হলো ইবাদত।”
(তিরমিযী)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ

অর্থ: “তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।”
(সূরা গাফির: ৬০)

এই আয়াতে আল্লাহ নিজেই বান্দাকে দোয়া করতে উৎসাহিত করেছেন।

দোয়া মুমিনের অস্ত্র

রাসূল ﷺ বলেছেন:

الدُّعَاءُ سِلَاحُ الْمُؤْمِنِ

অর্থ: “দোয়া হলো মুমিনের অস্ত্র।”

যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখনও আল্লাহর দরজা খোলা থাকে। মানুষ সাহায্য করতে না পারলেও আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম।

একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেটের অন্ধকারে বন্দী হয়ে গেলেন। চারদিকে অন্ধকার, সাহায্য করার মতো কেউ নেই। তখন তিনি এই দোয়া পড়লেন:

لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”

এই দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাঁকে মুক্তি দান করলেন।

এ থেকে বুঝা যায়, বিপদে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়াই মুমিনের পথ।

যিকির ও দোয়ার কয়েকটি আমল

সকাল-সন্ধ্যায় পড়া:

১. তাসবীহ

سُبْحَانَ اللّٰهِ

২. তাহমীদ

الْحَمْدُ لِلّٰهِ

৩. তাহলীল

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ

৪. তাকবীর

اللّٰهُ أَكْبَرُ

৫. ইস্তিগফার

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

রাসূল ﷺ দিনে সত্তর বারেরও বেশি এবং অন্য বর্ণনায় একশত বার ইস্তিগফার করতেন।

দোয়া কবুলের কিছু সময়

  • ফরয সালাতের পর
  • সিজদার মধ্যে
  • শেষ রাতে (তাহাজ্জুদের সময়)
  • জুমার দিনের বিশেষ সময়ে
  • রোজাদারের ইফতারের সময়
  • সফরের সময়
  • বৃষ্টির সময়

আমাদের বাস্তব অবস্থা

আজ আমরা মোবাইল, ব্যবসা, চাকরি, পরিবার—সবকিছুর জন্য সময় দিই; কিন্তু আল্লাহর যিকিরের জন্য খুব কম সময় দিই। অথচ কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় আফসোস হবে সেই সময়ের জন্য, যা আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অতিবাহিত হয়েছে।

হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন:

“দুনিয়ার প্রতিটি দিন তোমার জীবনের একটি অংশ। একটি দিন চলে গেলে তোমার জীবনেরও একটি অংশ চলে যায়।”

তাই আসুন, আমরা প্রতিদিন কিছু সময় যিকির, তিলাওয়াত ও দোয়ার জন্য নির্ধারণ করি।

উপসংহার

প্রিয় মুসল্লিগণ!

যিকির অন্তরকে জীবিত করে, গুনাহ মাফ করায় এবং আল্লাহর নৈকট্য দান করে। আর দোয়া বান্দাকে আল্লাহর সাথে যুক্ত করে, বিপদ দূর করে এবং রহমত লাভের মাধ্যম হয়।

আসুন আমরা বেশি বেশি পড়ি—

سُبْحَانَ اللّٰهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللّٰهِ الْعَظِيمِ

এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার করি—

أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ رَبِّي مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

সমাপনী দোয়া

اللّٰهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الذَّاكِرِينَ اللّٰهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ، وَاجْعَلْنَا مِنَ الدَّاعِينَ الْمُخْلِصِينَ، وَاغْفِرْ لَنَا وَلِوَالِدِينَا وَلِجَمِيعِ الْمُسْلِمِينَ.

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

وَصَلَّى اللّٰهُ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِينَ، وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. آمين.