بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أما بعد:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই সাহায্য চাই এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা তাঁর নিকট আমাদের নফসের অনিষ্টতা ও আমাদের আমলের মন্দ পরিণতি থেকে আশ্রয় চাই।
প্রিয় ঈমানদার ভাইয়েরা,
আজকের আলোচনার বিষয় “প্রতিবেশীর হক”। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে শুধু ইবাদত নয়; বরং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণকেও ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একজন মুসলমানের ঈমানের পরিপূর্ণতা নির্ভর করে তার প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণের উপরও।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ…
অর্থ: “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকীন, নিকটবর্তী প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, সহচর ও মুসাফিরের প্রতি সদাচরণ কর।” (সূরা আন-নিসা: ৩৬)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের পরপরই মানুষের হক আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আর সেই তালিকায় প্রতিবেশীর হক বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ، حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ
অর্থ: “জিবরীল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমি ধারণা করেছিলাম, হয়তো প্রতিবেশীকেও উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে।” (সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ. قِيلَ: مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
অর্থ: “আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়।” সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! তিনি কে?” তিনি বললেন, “যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।”(সহীহ আল-বুখারী)
আজ আমাদের সমাজে অনেক মানুষ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, কিন্তু প্রতিবেশী তার কারণে কষ্ট পায়। এটি ইসলামের শিক্ষা নয়।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ
অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।”
(সহীহ আল-বুখারী, সহীহ মুসলিম)
একজন মুসলমানের উচিত—
এক ইহুদি মহিলা প্রতিদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চলার পথে ময়লা ফেলত। একদিন ময়লা না দেখে তিনি জানতে চাইলেন, কী হয়েছে? জানা গেল, সে অসুস্থ। তখন রাসূল ﷺ তার বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিলেন। মহানবীর এই চরিত্র দেখে সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। (এই ঘটনাটি জনপ্রিয়ভাবে প্রচলিত হলেও এর সনদ শক্তিশালী নয়; তবে রাসূল ﷺ-এর প্রতিবেশীর প্রতি দয়া, ক্ষমা ও উত্তম আচরণের বহু সহীহ প্রমাণ বিদ্যমান।)
এই শিক্ষা হলো—উত্তম আচরণ অনেক সময় এমন প্রভাব ফেলে, যা কথার মাধ্যমে সম্ভব হয় না।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রা.) যখন একটি ছাগল জবাই করতেন, তখন বারবার বলতেন— “আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে দিয়েছ তো?” তারপর তিনি রাসূল ﷺ-এর সেই হাদিসটি পড়তেন—
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ…
এ থেকেই বোঝা যায়, মুসলিম হোক বা অমুসলিম—প্রতিবেশীর হক আদায় করতে হবে।
আজ আমরা—
এসব ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী।
১. প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।
২. নিয়মিত সালাম ও খোঁজখবর নেওয়া।
৩. খাবার রান্না করলে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু অংশ উপহার দেওয়া।
৪. তাদের দুঃখে-সুখে পাশে দাঁড়ানো।
৫. নিজের কারণে তাদের কোনো কষ্ট না হয়—সেদিকে সতর্ক থাকা।
৬. শিশুদেরও প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।
প্রিয় ভাইয়েরা,
একজন মুসলমানের পরিচয় শুধু মসজিদে নয়; বরং তার প্রতিবেশীর সাক্ষ্যেও প্রকাশ পায়। যদি প্রতিবেশী আমাদের সম্পর্কে বলে—”তিনি একজন ভালো মানুষ, আমাদের কখনো কষ্ট দেন না”—তবে সেটিই একজন প্রকৃত মুসলমানের বড় পরিচয়।
আসুন, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রতিবেশীর হক যথাযথভাবে আদায় করি এবং সমাজে শান্তি, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করি।
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْمُحْسِنِينَ إِلَى جِيرَانِنَا، وَاجْعَلْنَا مِمَّنْ يُؤَدُّونَ الْحُقُوقَ كَمَا تُحِبُّ وَتَرْضَى، وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا، وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا، وَاغْفِرْ لَنَا وَلِوَالِدِينَا وَلِلْمُؤْمِنِينَ أَجْمَعِينَ. آمِينَ.
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদেরকে প্রতিবেশীর প্রতি সদাচারকারী বানিয়ে দিন। আমাদেরকে সকলের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফীক দিন। আমাদের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করুন, পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করুন এবং আমাদের, আমাদের পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন। আমীন।
وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.