আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

প্রতিবেশীর হক

প্রতিবেশীর হক ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসে প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ, সহযোগিতা এবং তাদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আজকের জুমার খুতবায় আমরা প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে আলোচনা করব।

প্রথম খুতবা

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ. أما بعد،

হে ঈমানদারগণ! আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি।

আজকের খুতবার বিষয়— “প্রতিবেশীর হক”

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

ইসলাম শুধু আল্লাহর হক আদায়ের শিক্ষা দেয় না; বরং মানুষের হক আদায়ের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেয়। মানুষের হকের মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিবেশীর হক। একজন মুসলিমের ঈমানের পূর্ণতা নির্ভর করে সে তার প্রতিবেশীর সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার ওপরও।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ﴾

অর্থ: “তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকীন, নিকটবর্তী প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার কর।”
(সূরা আন-নিসা: ৩৬)

প্রতিবেশীর মর্যাদা

রাসূল ﷺ বলেছেন—

«مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»

অর্থ: “জিবরীল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন যে, আমি মনে করেছিলাম তিনি হয়তো প্রতিবেশীকেও উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।”
(সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

আরও বলেছেন—

«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ جَارَهُ»

অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।”
(সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

প্রতিবেশীর হকসমূহ

১. প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।

২. তাকে কষ্ট না দেওয়া।

রাসূল ﷺ বলেছেন—

«وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ». قِيلَ: مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»

অর্থ: “আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে মুমিন নয়।” সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, কে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, “যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।”
(সহিহ আল-বুখারি)

৩. অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া।

৪. বিপদে সাহায্য করা।

৫. আনন্দ-দুঃখে পাশে থাকা।

৬. প্রয়োজনে খাবার ও উপহার বিনিময় করা।

রাসূল ﷺ বলেছেন—

«يَا أَبَا ذَرٍّ، إِذَا طَبَخْتَ مَرَقًا فَأَكْثِرْ مَاءَهُ، وَتَعَاهَدْ جِيرَانَكَ»

অর্থ: “হে আবু যর! যখন তুমি ঝোল রান্না করবে, তখন তাতে একটু বেশি পানি দাও এবং তোমার প্রতিবেশীদেরও কিছু দাও।”
(সহিহ মুসলিম)

أقول قولي هذا وأستغفر الله لي ولكم ولسائر المسلمين، فاستغفروه إنه هو الغفور الرحيم.


দ্বিতীয় খুতবা

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

আজকের সমাজে অনেক বিবাদ, মামলা-মোকদ্দমা ও অশান্তির কারণ হলো প্রতিবেশীর অধিকার অবহেলা করা। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে হবে।

আমাদের করণীয়

  • প্রতিবেশীর সঙ্গে সালাম ও হাসিমুখে কথা বলা।
  • তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা।
  • শব্দদূষণ, ময়লা ফেলা বা অন্য কোনোভাবে তাদের কষ্ট না দেওয়া।
  • প্রয়োজনে আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা করা।
  • পারস্পরিক বিরোধ হলে ক্ষমা ও সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া।
  • সন্তানদের প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।

দোয়া

اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ الْمُحْسِنِينَ إِلَى جِيرَانِنَا، وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا، وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا، وَاجْعَلْ مُجْتَمَعَنَا آمِنًا مُطْمَئِنًّا.

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদেরকে প্রতিবেশীদের প্রতি সদ্ব্যবহারকারী বানান, আমাদের অন্তরগুলোতে ভালোবাসা সৃষ্টি করুন, পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করুন এবং আমাদের সমাজকে নিরাপদ ও শান্তিময় করে দিন।

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

وأقم الصلاة.

খতিবের জন্য উপসংহার

প্রতিবেশীর হক আদায় করা ইসলামী চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন প্রকৃত মুসলিম এমন ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে এবং যার প্রতিবেশীরা তার আচরণে শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করে। আসুন, আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রতিবেশীর অধিকার যথাযথভাবে আদায় করি এবং একটি শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলি।