ধৈর্য ও শোকর একজন মুমিনের জীবনের দুইটি মৌলিক গুণ। এই দুই গুণ ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না।
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. أما بعد:
সম্মানিত উপস্থিত ভাই ও বোনেরা,
আজকের আলোচনার বিষয় “ধৈর্য (সবর) ও শোকর”। একজন মুমিনের জীবন দুটি মহান গুণের উপর প্রতিষ্ঠিত—সবর এবং শোকর। আল্লাহ তাআলা কখনো বান্দাকে সুখ দিয়ে পরীক্ষা করেন, আবার কখনো দুঃখ দিয়ে পরীক্ষা করেন। সুখে যিনি শোকর করেন এবং দুঃখে যিনি সবর করেন, তিনিই আল্লাহর প্রিয় বান্দা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ﴾
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
আবার আল্লাহ বলেন—
﴿إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ﴾
“ধৈর্যশীলদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।”
(সূরা আয-যুমার: ১০)
সবর মানে শুধু বিপদ সহ্য করা নয়; বরং তিনটি ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা—
১. আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা।
২. গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
৩. বিপদ-আপদে অভিযোগ না করে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ»
“কাউকে সবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত কোনো নিয়ামত প্রদান করা হয়নি।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১৪৬৯; সহিহ মুসলিম)
আরেক হাদিসে তিনি বলেন—
«إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى»
“প্রকৃত ধৈর্য হলো বিপদের প্রথম আঘাতের সময়।”
(সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ﴾
“তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।”
(সূরা ইবরাহিম: ৭)
আরও বলেন—
﴿وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ﴾
“আমার বান্দাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই প্রকৃত কৃতজ্ঞ।”
(সূরা সাবা: ১৩)
শোকর শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার নাম নয়; বরং—
হযরত আয়িশা (রা.) বলেন—
রাসূলুল্লাহ ﷺ এত দীর্ঘ সময় তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে থাকতেন যে তাঁর পা ফুলে যেত। তখন তাঁকে বলা হলো—
“আল্লাহ তো আপনার পূর্বের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।”
তিনি বললেন—
«أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا»
“তাহলে আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?”
(সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম)
রাসূল ﷺ বলেছেন—
«عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ… إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ… وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ…»
“মুমিনের বিষয়টি বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুখ পেলে সে শোকর করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণ হয়। আর দুঃখ পেলে সে সবর করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণ হয়।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
দীর্ঘদিন রোগে আক্রান্ত থেকেও তিনি আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি।
আল্লাহ বলেন—
﴿إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا ۚ نِعْمَ الْعَبْدُ ۖ إِنَّهُ أَوَّابٌ﴾
“আমি তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। তিনি কতই না উত্তম বান্দা!”
(সূরা সাদ: ৪৪)
কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া, দাসত্ব, কারাবাস—সবকিছু ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তাঁকে মিসরের ক্ষমতা দান করেন।
আল্লাহ তাঁকে অগণিত নিয়ামত দান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—
﴿هَذَا مِن فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ﴾
“এটি আমার রবের অনুগ্রহ, তিনি আমাকে পরীক্ষা করছেন—আমি কৃতজ্ঞ হই, না অকৃতজ্ঞ।”
(সূরা আন-নামল: ৪০)
আজ আমরা সামান্য বিপদে হতাশ হয়ে পড়ি, আবার সামান্য সফলতায় অহংকার করি।
এটাই মুমিনের পরিচয়।
১. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা।
২. কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবন করা।
৩. বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
৪. আল্লাহর নিয়ামতগুলো নিয়ে প্রতিদিন চিন্তা করা।
৫. নবী-রাসূলদের জীবন অধ্যয়ন করা।
৬. বিপদে “إنا لله وإنا إليه راجعون” পাঠ করা এবং সুখে “الحمد لله” বলা।
প্রিয় মুসল্লিগণ,
দুনিয়ার জীবন পরীক্ষার মাঠ। এই পরীক্ষায় সফল হতে চাইলে দুটি গুণকে আঁকড়ে ধরতে হবে—
বিপদে সবর এবং নিয়ামতে শোকর।
যে ব্যক্তি এই দুই গুণ অর্জন করবে, সে দুনিয়াতেও শান্তি পাবে, আখিরাতেও সফল হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রকৃত ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন।
اللهم إنا نسألك صبرًا جميلًا، وشكرًا كثيرًا، وقلبًا خاشعًا، ولسانًا ذاكرًا، وعملاً صالحًا متقبلًا.
اللهم اجعلنا من الصابرين الشاكرين، واغفر لنا ولوالدينا ولجميع المسلمين.
وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين. آمين