আল-আনফাল ফাউন্ডেশন

গীবত, অপবাদ ও কুৎসার ক্ষতি

প্রথম খুতবা

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ. أما بعد،

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আমি নিজেকে এবং আপনাদের সবাইকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি।

আজকের খুতবার বিষয়— “গীবত, অপবাদ ও কুৎসার ক্ষতি”

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

মানুষের জিহ্বা আল্লাহর এক বড় নিয়ামত। এই জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও সত্য কথা বলা যায়; আবার এই জিহ্বা দিয়েই গীবত, অপবাদ, মিথ্যা ও কুৎসা রটিয়ে নিজের আখিরাত ধ্বংস করা যায়। তাই ইসলাম জিহ্বাকে সংযত রাখার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ﴾

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বিরত থাকো। কারণ কিছু ধারণা গুনাহ। তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করবে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।”
(সূরা আল-হুজুরাত: ১২)

গীবত কী?

রাসূল ﷺ সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন—

«أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟»

তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।

তিনি বললেন—

«ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ»

সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি যা বলছি তা যদি তার মধ্যে থাকে?”

তিনি বললেন—

«إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ»

অর্থ: “তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে—এটাই গীবত। যদি তা তার মধ্যে থাকে, তবে তুমি গীবত করলে; আর যদি না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ আরোপ করলে।”
(সহিহ মুসলিম)

গীবত, অপবাদ ও কুৎসার ক্ষতি

১. আল্লাহর নাফরমানি ও কবিরা গুনাহ।

২. নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়।

৩. মানুষের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।

৪. পরিবার ও সমাজে বিভেদ, বিদ্বেষ ও অশান্তি সৃষ্টি হয়।

৫. কিয়ামতের দিন মানুষের হক আদায় করতে হবে।

রাসূল ﷺ বলেছেন—

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ»

অর্থ: “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।”
(সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

أقول قولي هذا وأستغفر الله لي ولكم ولسائر المسلمين، فاستغفروه إنه هو الغفور الرحيم.


দ্বিতীয় খুতবা

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

সম্মানিত মুসল্লিগণ!

বর্তমান যুগে গীবত ও কুৎসা শুধু মুখে নয়; বরং মোবাইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। যাচাই ছাড়া কোনো সংবাদ, ছবি বা অভিযোগ শেয়ার করা একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا﴾

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো অবাধ্য ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও।”
(সূরা আল-হুজুরাত: ৬)

গীবত থেকে বাঁচার উপায়

  • কথা বলার আগে চিন্তা করা।
  • মানুষের দোষ অনুসন্ধান না করা।
  • অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা পরিহার করা।
  • কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর যিকিরে জিহ্বাকে ব্যস্ত রাখা।
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া কিছু প্রচার না করা।
  • গীবতের আসরে থাকলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা অথবা সেখান থেকে উঠে যাওয়া।
  • কারও হক নষ্ট করলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করা।

দোয়া

اللَّهُمَّ احْفَظْ أَلْسِنَتَنَا مِنَ الْكَذِبِ وَالْغِيبَةِ وَالنَّمِيمَةِ، وَطَهِّرْ قُلُوبَنَا مِنَ الْحِقْدِ وَالْحَسَدِ، وَاجْعَلْنَا مِنْ عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ.

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের জিহ্বাকে মিথ্যা, গীবত ও কুৎসা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পবিত্র করুন এবং আমাদেরকে আপনার নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ. إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ. وأقم الصلاة.

খতিবের জন্য উপসংহার

মনে রাখবেন, একজন মুসলিমের পরিচয় হলো—তার জিহ্বা ও হাত থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। তাই আসুন, আমরা গীবত, অপবাদ, কুৎসা, মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আমাদের কথা, লেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি বিষয় যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিহ্বার হেফাজত করার এবং সত্য ও কল্যাণের কথা বলার তাওফীক দান করুন। আমীন।